ডিজিটাল সংযোগ বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন জিএসএমএ–এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের শীর্ষ কর্মকর্তা জুলিয়ান গোরম্যান। তাঁর মতে, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানসম্পন্ন ইন্টারনেটের আওতায় এনে ডিজিটাল দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ডিজিটাল সংযোগের ভূমিকা সম্পর্কে জুলিয়ান গোরম্যান বলেন, একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রথমবারের মতো নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হলে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মিয়ানমারে কাজ করার সময় তিনি এর বাস্তব উদাহরণ দেখেছেন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে এখনো প্রায় অর্ধেক মানুষ মোবাইল ব্রডব্যান্ড বা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সংযোগের আওতায় আনা সম্ভব হলে কৃষকদের জীবন, শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে সরকারি সেবাও জনগণের দোরগোড়ায় আরও সহজে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তবে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রকৃত রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন (Innovation)—যা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার কার্যকর ডিজিটাল সমাধান তৈরি করবে।
সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন নিশ্চিত করার প্রয়োজন
গ্রামীণ ও কম আয়ের মানুষের কাছে ইন্টারনেট আরও সাশ্রয়ী করতে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জুলিয়ান গোরম্যান। তিনি বলেন, বাজেটে সিম কার্ডের ওপর থেকে কর তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সংযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে।
তবে তাঁর মতে, এখনো স্মার্টফোনের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় বাধা। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অবকাঠামোর খরচ কমাতে অবকাঠামো ভাগাভাগি (Infrastructure Sharing) এবং স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এ বছরের শেষে নির্ধারিত স্পেকট্রাম নবায়ন প্রক্রিয়ায় অপারেটরদের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হলে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমার পাশাপাশি সেবার মানও উন্নত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এর পাশাপাশি মানুষের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন জুলিয়ান গোরম্যান। তাঁর মতে, মানুষকে নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দিতে হবে।
তরুণদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন জুলিয়ান গোরম্যান। তাঁর মতে, দেশের ৩৫ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। প্রযুক্তির প্রতি এই তরুণদের আগ্রহ এবং নতুন কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
তিনি বলেন, একবার তরুণরা ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইসহ অসংখ্য বিষয়ে বিনা মূল্যে অনলাইনে শেখার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে তারা নতুন দক্ষতা অর্জন করে ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমির মাধ্যমে ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে পারবে।
সরকারের ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আইসিটি খাতকে রপ্তানির প্রধান খাত হিসেবে গড়ে তুলতে তরুণদের দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর মতে, মানসম্পন্ন ডিজিটাল সংযোগের ওপর ভিত্তি করে সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
সিমের ব্যবহার বেশি হলেও ইন্টারনেট ব্যবহারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক সিম কার্ড ব্যবহৃত হলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। এই ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন জুলিয়ান গোরম্যান।
প্রথমত, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্মার্টফোনের দাম নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের আস্থার সংকট দূর করতে হবে।
অনলাইন জালিয়াতি ও স্ক্যামের আশঙ্কায় অনেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সরকার যখন নাগরিক সেবাগুলোকে আরও বেশি ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে আসবে, তখন মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি বাস্তব প্রয়োজন তৈরি হবে। তাঁর মতে, এর ফলে দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।
নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন জুলিয়ান গোরম্যান। তাঁর মতে, বর্তমানে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল স্ক্যাম ও অনলাইন জালিয়াতি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জালিয়াতি প্রতিরোধে জিএসএমএ বৈশ্বিকভাবে ‘United Against Scams’ উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ করছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির ‘Open Gateway’ কর্মসূচির আওতায় এমন প্রযুক্তি বা এপিআই নিয়ে আসা হচ্ছে, যা এসএমএস ওটিপি ছাড়াই ব্যাকগ্রাউন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইল নম্বর যাচাই করতে সক্ষম হবে।
এর ফলে গ্রাহকদের জালিয়াতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখাই অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আগামী এক দশক নিয়ে আশাবাদী জুলিয়ান গোরম্যান
বাংলাদেশের আগামী এক দশকের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী জুলিয়ান গোরম্যান। তাঁর মতে, বাংলাদেশ সরকার আইসিটি খাতকে দেশের রূপান্তরের অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। সিম কার্ডের ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্তও তিনি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় ও উদীয়মান বাজার বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ভিয়েতনাম ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—সঠিক নিয়ন্ত্রণনীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ একটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের এই যাত্রায় জিএসএমএ পাশে থাকবে বলেও জানান জুলিয়ান গোরম্যান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
Leave a Reply