
এআই-ভিত্তিক চাকরি বিলুপ্তির আশঙ্কা এখনো অমূলক; রূপান্তর চলছে কাজের গতি ও ধরণে, নতুন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত অর্থনীতিবিদদের
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশে বিপুল পরিমাণ চাকরি এক লহমায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে—কয়েক বছর ধরে চলা এমন ভীতিকর পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হয়নি। তবে গণহারে কর্মী ছাঁটাই না হলেও কর্মক্ষেত্রে নিঃশব্দে এক বিশাল রূপান্তর ঘটে চলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই মূলত পদ বিলুপ্ত করার চেয়ে কাজের ধরণ বদলে দিচ্ছে এবং এর পূর্ণ প্রভাব পড়তে বহু বছর সময় লাগতে পারে।
পূর্বাভাস বনাম বাস্তব চিত্র
২০২৫ সালের মে মাসে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এআইয়ের কারণে এন্ট্রি-লেভেলের অর্ধেক হোয়াইট-কলার চাকরি হারিয়ে যাবে। তার পরের মাসেই ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান নির্দিষ্ট কিছু পেশা বিলুপ্ত হওয়ার বার্তা দেন। এসব বক্তব্যের পর অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআইকে দায়ী করতে শুরু করে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অন্য কথা বলছে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকনোমিক পলিসি রিসার্চের (এসআইইপিআর) এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি চালুর পর থেকে এআইয়ের সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা ২০ শতাংশ শ্রমিকের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে মাত্র ০.৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে এআইয়ের সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ছিল ০.৮৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। সদ্য স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়ে ৫.৬ শতাংশ হলেও সেটির পেছনে দূরবর্তী কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) এবং মহামারি-পরবর্তী অতিরিক্ত নিয়োগের সমন্বয় সাধনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউটের ফেলো এরিকা ম্যাকএন্টারফার বলেন, “কম্পিউটার বিপ্লব শ্রমবাজারে পুরোপুরি প্রভাব ফেলতে কয়েক দশক সময় নিয়েছিল। বর্তমানে আমরা যা দেখছি, তা-ও অনেকটা সেরকম।”
চাকরি হারাচ্ছে না, বদলাচ্ছে ধরন
অর্থনীতিবিদদের মতে, এআইয়ের বর্তমান প্রধান প্রভাব কর্মসংস্থানের সংখ্যার ওপর নয়, বরং কাজের প্রকৃতির ওপর পড়ছে। জিপরিক্রুটারের সাম্প্রতিক নিয়োগদাতা জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭৪ শতাংশ নিয়োগকারী এআই দক্ষতাকে অতিরিক্ত যোগ্যতা বা আবশ্যক শর্ত হিসেবে দেখছেন। ৫০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান আশা করে, চাকরিপ্রার্থীরা প্রথম দিন থেকেই এআই ব্যবহারে পারদর্শী হবেন।
জিপরিক্রুটারের শ্রম অর্থনীতিবিদ নিকোল বাচাউড জানান, “সবচেয়ে স্পষ্ট প্রবণতাটি হলো কর্মীদের দক্ষতার মানদণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া, পদ সংখ্যা কমে যাওয়া নয়। শ্রমবাজারের মূল চ্যালেঞ্জ এখন চাকরির অভাব নয়, বরং সঠিক দক্ষতার অভাব।”
এনওয়াইইউ স্টার্ন-এর অধ্যাপক রবার্ট সিমান্স এআইয়ের প্রভাবকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
১. বিলুপ্ত হওয়া কাজ
২. নতুন তৈরি হওয়া কাজ
৩. রূপান্তরিত কাজ
তার মতে, ৩ নম্বর ক্ষেত্রটিই সবচেয়ে বড়। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একজন ব্যক্তির কাজের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা চাকরির সংখ্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে সময় নেয়।
চুক্তভিত্তিক কাজের প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
এমআইটির ইমেরিটাস অধ্যাপক পল অস্টারম্যানের মতে, এআইয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ী কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে ফ্রিল্যান্সার ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তার গবেষণা অনুযায়ী, মার্কিন শ্রমশক্তির ৩৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য, যা এআইয়ের প্রভাবে আরও তীব্র হতে পারে।
স্ট্যানফোর্ডের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস ব্লুমের মতে, এআই গ্রহণের গতি সীমিত করার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, নতুন পদ নির্ধারণ ও রাজনৈতিক পরিবেশ কাজ করছে। ভবিষ্যতে এআই সেফটি ও ডেটা সেন্টার সংক্রান্ত ইস্যুতে রাজনৈতিক কড়াকড়িও দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য নিজেদের দক্ষতা ও নেটওয়ার্ক বাড়ানোই সুরক্ষার পথ। তবে নিম্ন-দক্ষতার কর্মীদের অধিকার ও কাজের মান সুরক্ষায় সরকারি নীতিমালার হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠবে।
সংবাদ বিশ্লেষণ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশে বিপুল পরিমাণ চাকরি এক লহমায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে—কয়েক বছর ধরে চলা এমন ভীতিকর পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হয়নি। তবে গণহারে কর্মী ছাঁটাই না হলেও কর্মক্ষেত্রে নিঃশব্দে এক বিশাল রূপান্তর ঘটে চলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই মূলত পদ বিলুপ্ত করার চেয়ে কাজের ধরণ বদলে দিচ্ছে এবং এর পূর্ণ প্রভাব পড়তে বহু বছর সময় লাগতে পারে।
পূর্বাভাস বনাম বাস্তব চিত্র
২০২৫ সালের মে মাসে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এআইয়ের কারণে এন্ট্রি-লেভেলের অর্ধেক হোয়াইট-কলার চাকরি হারিয়ে যাবে। তার পরের মাসেই ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান নির্দিষ্ট কিছু পেশা বিলুপ্ত হওয়ার বার্তা দেন। এসব বক্তব্যের পর অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআইকে দায়ী করতে শুরু করে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অন্য কথা বলছে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকনোমিক পলিসি রিসার্চের (এসআইইপিআর) এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি চালুর পর থেকে এআইয়ের সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা ২০ শতাংশ শ্রমিকের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে মাত্র ০.৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে এআইয়ের সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ছিল ০.৮৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। সদ্য স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়ে ৫.৬ শতাংশ হলেও সেটির পেছনে দূরবর্তী কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) এবং মহামারি-পরবর্তী অতিরিক্ত নিয়োগের সমন্বয় সাধনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউটের ফেলো এরিকা ম্যাকএন্টারফার বলেন, “কম্পিউটার বিপ্লব শ্রমবাজারে পুরোপুরি প্রভাব ফেলতে কয়েক দশক সময় নিয়েছিল। বর্তমানে আমরা যা দেখছি, তা-ও অনেকটা সেরকম।”
চাকরি হারাচ্ছে না, বদলাচ্ছে ধরন
অর্থনীতিবিদদের মতে, এআইয়ের বর্তমান প্রধান প্রভাব কর্মসংস্থানের সংখ্যার ওপর নয়, বরং কাজের প্রকৃতির ওপর পড়ছে। জিপরিক্রুটারের সাম্প্রতিক নিয়োগদাতা জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭৪ শতাংশ নিয়োগকারী এআই দক্ষতাকে অতিরিক্ত যোগ্যতা বা আবশ্যক শর্ত হিসেবে দেখছেন। ৫০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান আশা করে, চাকরিপ্রার্থীরা প্রথম দিন থেকেই এআই ব্যবহারে পারদর্শী হবেন।
জিপরিক্রুটারের শ্রম অর্থনীতিবিদ নিকোল বাচাউড জানান, “সবচেয়ে স্পষ্ট প্রবণতাটি হলো কর্মীদের দক্ষতার মানদণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া, পদ সংখ্যা কমে যাওয়া নয়। শ্রমবাজারের মূল চ্যালেঞ্জ এখন চাকরির অভাব নয়, বরং সঠিক দক্ষতার অভাব।”
এনওয়াইইউ স্টার্ন-এর অধ্যাপক রবার্ট সিমান্স এআইয়ের প্রভাবকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
১. বিলুপ্ত হওয়া কাজ
২. নতুন তৈরি হওয়া কাজ
৩. রূপান্তরিত কাজ
তার মতে, ৩ নম্বর ক্ষেত্রটিই সবচেয়ে বড়। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একজন ব্যক্তির কাজের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা চাকরির সংখ্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে সময় নেয়।
চুক্তভিত্তিক কাজের প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
এমআইটির ইমেরিটাস অধ্যাপক পল অস্টারম্যানের মতে, এআইয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ী কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে ফ্রিল্যান্সার ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তার গবেষণা অনুযায়ী, মার্কিন শ্রমশক্তির ৩৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য, যা এআইয়ের প্রভাবে আরও তীব্র হতে পারে।
স্ট্যানফোর্ডের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস ব্লুমের মতে, এআই গ্রহণের গতি সীমিত করার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, নতুন পদ নির্ধারণ ও রাজনৈতিক পরিবেশ কাজ করছে। ভবিষ্যতে এআই সেফটি ও ডেটা সেন্টার সংক্রান্ত ইস্যুতে রাজনৈতিক কড়াকড়িও দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য নিজেদের দক্ষতা ও নেটওয়ার্ক বাড়ানোই সুরক্ষার পথ। তবে নিম্ন-দক্ষতার কর্মীদের অধিকার ও কাজের মান সুরক্ষায় সরকারি নীতিমালার হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠবে।