🇧🇩 A National Initiative — Empowering Bangladesh's Global Workforce
Technology

সংসার ও সন্তান সামলে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল খাগড়াছড়ির তানিয়া

November 30, 2025 · First Bangladesh

অল্প বয়সে বিয়ে, এরপর সংসারের দায়িত্ব এবং সন্তান লালন-পালন—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতিতে নারীদের ক্যারিয়ারের স্বপ্নগুলো থমকে যায়। কিন্তু খাগড়াছড়ির ২২ বছর বয়সী তানিয়া খলিল প্রমাণ করেছেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই সামনে টিকতে পারে না। সংসার ও শিশুসন্তান সামলিয়ে তিনি কেবল একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি; পাশাপাশি অন্য নারীদেরও ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলছেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় প্রায় এক লাখ টাকা।

একনজরে তানিয়া খলিলের সাফল্যযাত্রা

বিষয়বিবরণ
উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারতানিয়া খলিল (২২)
নিজ এলাকাবাজারপাড়া, মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি (বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদর)
দক্ষতার ক্ষেত্রগ্রাফিক ডিজাইন (লোগো, ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি, বিজনেস কার্ড ইত্যাদি)
কর্মক্ষেত্র (মার্কেটপ্লেস)ফাইভার (Fiverr) ও আপওয়ার্ক (Upwork)
মাসিক আয়প্রায় ১,০০,০০০ টাকা
প্রতিষ্ঠানখলিল আইটি (স্বামী ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে যৌথভাবে)
সামাজিক অবদানএ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ নারীকে আইটি প্রশিক্ষণ প্রদান

আগ্রহ থেকে পেশাদারত্বের শুরু

তানিয়ার বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভার বাজারপাড়া এলাকায়। ২০২১ সালে মাটিরাঙ্গা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী ইব্রাহিম খলিল পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার। মূলত স্বামীর অনুপ্রেরণাতেই তানিয়ার ফ্রিল্যান্সিং জগতে পদার্পণ।

বিয়ের পর পড়াশোনা ও সংসারের চাপের মাঝেও ঘরে বসে কিছু করার তাগিদ অনুভব করতেন তানিয়া। তিনি জানান, প্রথমে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করেন। রং, লেআউট, টাইপোগ্রাফি—সবকিছু নতুন হলেও প্রবল আগ্রহের কারণে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন।

১৩ ডলার থেকে লাখ টাকার মাইলফলক

ফ্রিল্যান্সিং শেখা অবস্থাতেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কাজের সুযোগ পান তানিয়া। একটি লোগো ডিজাইন করে সে মাসে তিনি আয় করেছিলেন ১৩ ডলার।

“প্রথম আয় আমাকে অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। মনে হয়েছিল সত্যিই কিছু করার সামর্থ্য আমার আছে।” — তানিয়া খলিল

প্রাথমিক সাফল্যের পর তানিয়া ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি, বিজনেস কার্ড, লেটারহেড তৈরিসহ গ্রাফিক ডিজাইনের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করেন। ক্লায়েন্টদের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে দ্রুতই ফাইভার ও আপওয়ার্কের মতো জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং আয়ের গ্রাফও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে।

ফ্রিল্যান্সার তৈরির কারিগর: ‘খলিল আইটি’

তানিয়া শুধু নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি; তিনি খাগড়াছড়ির পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেন। ২০২১ সাল থেকে স্বামীর আইটি প্রতিষ্ঠান ‘খলিল আইটি’-তে প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালের শুরুতে এই দম্পতি মাটিরাঙ্গা থেকে খাগড়াছড়ি সদরে চলে আসেন এবং বর্তমানে খাগড়াছড়ি গেট এলাকায় তাঁদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।

সম্প্রতি প্রশিক্ষণকেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলার একটি বিশাল কক্ষে সারিবদ্ধভাবে বসে ল্যাপটপে কাজ শিখছেন একঝাঁক তরুণী, আর তানিয়া তাঁদের গ্রাফিক ডিজাইনের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ নারীকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাঁদের অনেকেই এখন ঘরে বসে উপার্জন করছেন।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য:

  • সুমা জান্নাত: “চার মাস শেখার পরই কাজ শুরু করি। এখন ঘরে বসে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারি।”
  • তৃণা রোয়াজা: “ফ্রিল্যান্সিং শিখে এখন নিজেই আয় করি। পরিবারের কাছে হাত পাততে হয় না, পড়াশোনার খরচও নিজে চালাতে পারছি।”

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সরকারি মূল্যায়ন

সময়মতো বায়ারের কাজ জমা দেওয়া, সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা এবং সন্তান ও সংসার সামলানো—সব মিলিয়ে তানিয়ার প্রতিদিনের রুটিন বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে পরিবারের, বিশেষ করে স্বামীর সমর্থনকে তিনি তাঁর সফলতার সবচেয়ে বড় নিয়ামক বলে মনে করেন। একটি কম্পিউটার এবং একাগ্রতা থাকলে যে কেউই ক্যারিয়ার গড়তে পারেন—এই বার্তাই তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের মাঝে।

তানিয়ার এই অনন্য উদ্যোগ নজর কেড়েছে স্থানীয় প্রশাসনেরও। খাগড়াছড়ি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুস্মিতা খীসা বলেন,

“নারীদের আইসিটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণে সরকার কাজ করছে। তানিয়া খলিল নিজে দক্ষতা অর্জন করে অন্য নারীদেরও যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাদের অধিদপ্তরে অনেক সময় অস্থায়ী প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হয়; তখন অবশ্যই তাঁর কথা বিবেচনা করা হবে।”

তানিয়া খলিল আজ কেবল একজন সফল ফ্রিল্যান্সার নন, তিনি খাগড়াছড়ির নারীদের আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *