বিশেষ বিশ্লেষণ
বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশ থেকে অর্থ আসলেই তা ‘রেমিট্যান্স’ এবং সেই সূত্রে সম্পূর্ণ করমুক্ত—এমন একটি প্রচলিত ধারণা অনেক পেশাজীবীর মধ্যেই রয়েছে। তবে আয়কর আইন ২০২৩-এর আলোকে বিষয়টি এত সরল নয়। রিমোট ওয়ার্ক বা বিপিও (BPO) খাতের আয়ের ওপর কর প্রযোজ্য হবে কি না, তা মূলত করদাতার ‘আবাসিক স্থিতি’ (Residency Status) এবং আয়ের ‘উৎস’-এর ওপর নির্ভর করে।
১. আবাসিক করদাতা কে? (ধারা ২৬ ও ২(৪৫))
আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এক করবর্ষে বাংলাদেশে অন্তত ১৮৩ দিন অবস্থান করেন, কিংবা বিগত চার বছরে মোট ৩৬৫ দিনসহ সংশ্লিষ্ট করবর্ষে অন্তত ৯০ দিন অবস্থান করেন, তবে তিনি ‘আবাসিক করদাতা’ হিসেবে গণ্য হবেন।
আয়কর আইনের ২৬ ধারা মতে, একজন আবাসিক করদাতার বৈশ্বিক আয়ের ওপর (উপার্জন স্থান যেখানেই হোক) বাংলাদেশে কর প্রযোজ্য। তাই বাংলাদেশ থেকে কাজ করা অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার ও দূরবর্তী কর্মী (Remote Workers) আইনিভাবে আবাসিক করদাতা এবং তাদের আয় কর জালে পড়ে।
২. আয়ের উৎস নির্ধারণ (ধারা ২৭)
বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ আসলেও, আয়টি কোথায় অর্জিত হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। ২৭ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থান করে বিদেশী কোনো সংস্থাকে সেবা দিলে অর্জিত অর্থ ‘বাংলাদেশের উৎসের আয়’ হিসেবেই গণ্য হবে।
আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে—বাংলাদেশে সম্পাদিত কাজ বা সেবা, স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা সম্পদ থেকে আয়, কিংবা সরকার/আবাসিক ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত ফি, রয়্যালটি ও কারিগরি সেবার ফি সবই বাংলাদেশের উৎসজাত আয়।
৩. করছাড়ের শর্ত ও ভুল ধারণার অবসান (ষষ্ঠ তফসিল)
আয়কর আইনের ষষ্ঠ তফসিলের ১ম খণ্ডের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে সশরীরে অবস্থান করে অর্জিত আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনলে তা করমুক্ত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থান করে দূরবর্তী কাজের (Remote Work) মাধ্যমে অর্জিত অর্থ এই সুবিধার আওতায় পড়ে না, কারণ তারা প্রবাসী বা অনাবাসিক নন।
তবে প্রযুক্তি খাতের জন্য বিশেষ কর অব্যাহতির সুযোগ রয়েছে:
প্রযুক্তি খাতের বিশেষ অব্যাহতি (অনুচ্ছেদ ২১):
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এআই (AI) সলিউশন, ডাটা অ্যানালিটিক্স, আইটি ফ্রিল্যান্সিং ও সুনির্দিষ্ট বিপিও (যেমন: কল সেন্টার, ডিজিটাল আর্কাইভ) সেবা করমুক্ত থাকবে।
শর্তাবলি: সেবা প্রদানকারীকে নিবন্ধিত ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হতে হবে এবং বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (TIN), বিন (BIN) ও সঠিক ব্যাংকিং লেনদেন বজায় রাখতে হবে।
(নোট: বিদেশী প্রতিষ্ঠানে সরাসরি চাকরির বিপরীতে প্রাপ্ত নিয়মিত বেতন এই সুবিধার বাইরে।)
৪. উৎস কর কর্তন (উৎস কর ধারা ১২৪ ও ১৫০)
আইনের ১২৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশে সম্পাদিত সেবার বিনিময় মূল্য বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসলে ১০ শতাংশ হারে উৎস কর (TDS) কর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক অর্থ জমা করার সময় এই কর কেটে নেয়। ১৫০ ধারা অনুযায়ী, কেটে নেওয়া এই অর্থ বার্ষিক রিটার্নে সমন্বয় করা সম্ভব। তবে অনেক করদাতা ব্যাংকের দেওয়া ট্যাক্স চালান বা চালান কপি সংগ্রহ না করায় পরে এই রেয়াত সুবিধা দাবি করতে পারেন না।
সংক্ষেপে: চাকরি বনাম ব্যবসা
- ব্যবসা/প্রকল্পভিত্তিক আয়: আপওয়ার্ক, ফাইভার বা নির্দিষ্ট প্রজেক্টভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং আয় ‘ব্যবসায়িক আয়’ হিসেবে গণ্য হয় এবং সঠিক নিবন্ধন থাকলে প্রযুক্তি খাতের আওতায় করমুক্ত হতে পারে।
- দূরবর্তী চাকরি (Remote Salary): বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বেতন হিসেবে প্রাপ্ত আয় সরাসরি ‘চাকরিজনিত আয়’ হিসেবে করযোগ্য।
বিদেশ থেকে টাকা আসলেই তা রেমিট্যান্স বা করমুক্ত—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশ্ব অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আইনের সঠিক নিয়ম মেনে আয় ঘোষণা করা একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের অন্যতম কর্তব্য।
Leave a Reply