সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম)—যেমন চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি এবং অ্যানথ্রোপিকের ক্লড—মানব ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত গৃহীত প্রযুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, আইন পেশা, বিপণন এবং গ্রাহকসেবাসহ প্রায় প্রতিটি খাতে এই টুলের ব্যবহার বাড়ছে। ম্যাককিনসির ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নিয়মিত জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে। তবে এই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে নীতিপ্রণেতা ও ব্যবসায়িক নেতাদের মধ্যে কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব: তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা
তাত্ত্বিকভাবে এআই শ্রমবাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।বাষ্পীয় ইঞ্জিন, পার্সোনাল কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের মতো পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মতোই এআই-ও কাজের কাঠামো বদলে দিচ্ছে।প্রভাবটি ইতিবাচক হবে নাকি নেতিবাচক, তা নির্ভর করছে এআই মানবশ্রমকে ‘প্রতিস্থাপন’ করছে নাকি ‘সহযোগিতা’ করছে তার ওপর।
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ধারা:একদল গবেষকের মতে, এআই কর্মীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।এটি একঘেয়ে বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো নিজে নিয়ে মানুষকে সৃজনশীল ও কৌশলগত কাজে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
- শ্রম প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি:অপর পক্ষে, যখন এআই কম খরচে মানুষের সমান মানের কাজ করতে পারে, তখন কাজের চাহিদা সরাসরি কমে যায়। অর্থনীতিবিদ অসেমোগ্লু ও রেস্ত্রেপোর মতে, অটোমেশনের সঙ্গে সঙ্গে যদি মানুষের জন্য নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি না হয়, তবে বাজারে কর্মী ছাঁটাই এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেতে পারে।
অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাস্তব আঘাত: আপওয়ার্কের ডেটা
ঐতিহ্যবাহী কর্মসংস্থান চুক্তির জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে এআইয়ের প্রভাব পরিমাপ করা কঠিন।তাই সাম্প্রতিক এক গবেষণায় (Hui et al., Organization Science) বিশ্বখ্যাত ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম আপওয়ার্ক (Upwork)-এর ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ২০২২ সালে টেক্সট-ভিত্তিক (যেমন চ্যাটজিপিটি) এবং ইমেজ-ভিত্তিক (যেমন ডাল-ই ২, মিডজার্নি) এআই প্রকাশের পরের ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়।
| সূচক | প্রভাবিত কাজের ক্ষেত্রসমূহ | প্রভাবের পরিমাণ |
| মাসিক নতুন চুক্তি | কপি এডিটিং, প্রুফ রিডিং, টেক্সট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন | ২% হ্রাস |
| মাসিক মোট আয় | টেক্সট ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি ক্ষেত্রসমূহ | ৫% হ্রাস |
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই মডেলগুলো চালুর মাত্র ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে কর্মসংস্থান ও আয় উভয় ক্ষেত্রে এই পতন ঘটে।গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই নেতিবাচক প্রবণতা কোনো সাময়িক ধস নয়, বরং স্থায়ী রূপ নিচ্ছে এবং প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, এই বৈষম্য তত বিস্তৃত হতে পারে।
দক্ষ ও অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারদের ওপর বড় আঘাত
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীরা যেকোনো ধাক্কা সহজেই সামলে নিতে পারেন।কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে এক বিপরীতমুখী ও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে।
- দক্ষতার ব্যবধান কমে যাওয়া:চ্যাটজিপিটি বা ডাল-ই ২-এর মতো টুলের কারণে কম অভিজ্ঞ বা অপেক্ষাকৃত কম রেটিং পাওয়া ফ্রিল্যান্সাররাও এখন শীর্ষমানের ফ্রিল্যান্সারদের সমকক্ষ কাজ উপহার দিতে পারছেন।
- অভিজ্ঞদের বড় ক্ষতি: ক্লায়েন্টরা এখন আর প্রিমিয়াম মূল্য দিয়ে শীর্ষ রেটিংপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্সারদের নিয়োগ করতে চাচ্ছেন না, কারণ কম খরচে এআই টুলের মাধ্যমে একই মানের সেবা মিলছে। ফলে বেশি রেটিং এবং ভালো অতীত ইতিহাস থাকা অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারদের কাজ ও আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে।
নীতি নির্ধারণে নতুন ভাবনার তাগিদ
গবেষণার তথ্য ইঙ্গিত করে যে, প্রথাগত শ্রম আইন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ফ্রিল্যান্সার ও অসংগঠিত খাতের কর্মীদের সুরক্ষায় প্রস্তুত নয়। গিগ ইকোনমি এবং অস্থায়ী চুক্তিতে কাজ করা কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বা বেকারত্ব বিমার সুযোগ পান না, ফলে প্রযুক্তির এই আকস্মিক রূপান্তরে তারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদে দীর্ঘস্থায়ী সুফল পেতে নীতিপ্রণেতাদের ৩টি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
- পুনঃদক্ষতায় বিনিয়োগ: কর্মীদের এআইয়ের পরিপূরক নতুন দক্ষতা (Reskilling) অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন করা।
- শ্রম সুরক্ষার আধুনিকায়ন: ফ্রিল্যান্সার ও গিগ ওয়ার্কারদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো ও ইউনিয়ন গঠনের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা।
- মানব-এআই সহাবস্থান:প্রযুক্তি যাতে মানুষকে প্রতিস্থাপন না করে বরং মানুষের সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, তেমন কর্মপরিবেশ তৈরিতে উৎসাহ প্রদান।
Leave a Reply