বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড রিপোর্ট ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং সম্প্রদায়ের ১৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশ। ভূগোল ও সনাতন কর্মঘণ্টার সীমানা পেরিয়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতভিত্তিক এই পরিবর্তন বৈশ্বিক ডিজিটাল সেবা বা আউটসোর্সিং বাজারে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থান প্রদান করেছে।
গ্লোবাল ডিজিটাল সার্ভিসে বাংলাদেশ: মূল তথ্যসমূহ
| সূচক / বিষয় | বর্তমান চিত্র ও উপাত্ত |
| বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিংয়ে বৈশ্বিক অবদান | বিশ্বের মোট ফ্রিল্যান্সারের ১৪% |
| সক্রিয় মার্কেটপ্লেস ও ফ্রিল্যান্সার | ১৫৩টি মার্কেটপ্লেসে আনুমানিক ১০ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার |
| ওয়েব ডিজাইন খাতে গড় আয় | ২১ থেকে ২৮ মার্কিন ডলার / ঘণ্টা |
| ডিজিটাল সেবা রপ্তানি প্রবৃদ্ধি | ২০০৫ সাল থেকে গড়ে বার্ষিক ১৫% বৃদ্ধি |
| ই-কমার্স খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি | ১৮% |
| জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান | ১.২৮% |
| বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান | বর্তমানে ৩ লাখ (পরোক্ষসহ); ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ |
প্রথাগত চাকরির বাইরে তরুণদের পছন্দ ফ্রিল্যান্সিং
প্রথাগত নয়টা-পাঁচটার চাকরির গণ্ডি পেরিয়ে প্রান্তিক ও শহরঞ্চলের তরুণদের কাছে ফ্রিল্যান্সিং এখন একটি স্বাবলম্বী পেশা। একটি দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয়ে বহু তরুণ প্রতি মাসে হাজার হাজার ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন।
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (BFDS) চেয়ারম্যান তানজিবা রহমানের মতে, দেশে নিবন্ধিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে প্রায় ১.০ মিলিয়ন (১০ লাখ) ফ্রিল্যান্সার নিবন্ধিত ১৫৩টি আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ উদ্যোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এই জোয়ার তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে।
বাজার ও আয়ের সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ খরচ কমানো ও দক্ষ কর্মী খোঁজার তাগিদে বাংলাদেশের আইটি বিশেষজ্ঞদের ওপর উত্তরোত্তর নির্ভর করছে। বিশেষ করে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে উচ্চ চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
- ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইন: পেশাদারদের গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় $২১ – $২৮ ডলার।
- সফটওয়্যার উন্নয়ন ও ব্যাক-অফিস অপারেশনস: দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ।
- ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাফিক ডিজাইন: দ্রুত বিকাশমান সার্ভিস খাত।
কৌশলগত রূপান্তর: উচ্চ মূল্যের চাকরির দিকে যাত্রার আহ্বান
সেক্টরের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজিবা রহমান নিম্ন-মজুরি বা প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ থেকে বেরিয়ে উচ্চ-মজুরির বিশেষায়িত (Specialized) কাজের দিকে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
“প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা করে প্রযুক্তিগত শিক্ষা গ্রহণ এবং নিজস্ব পছন্দের বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জনই বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যে ফ্রিল্যান্সিং করার প্রধান চাবিকাঠি।”
আইসিটি খাত ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর তথ্যসূত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়:
- ২০২০-২১ অর্থবছর: ৪০০টি আইটি প্রতিষ্ঠান ৮০টি দেশে ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সেবা রপ্তানি করেছে।
- ২০২১-২২ অর্থবছর: গন্তব্য নিশ্চিতভাবে প্রসারিত হয়ে ১৬৭টি দেশে দাঁড়ায় এবং রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: বর্তমানে আইসিটি খাত জাতীয় জিডিপিতে ১.২৮% অবদান রাখছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এই খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ৫ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিক দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিশ্ববাজারের চাহিদানুযায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
Leave a Reply