
বাংলাদেশে সাধারণত পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ থেকে তরুণদের নির্দিষ্ট কিছু প্রথাগত পেশায়—যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী বা করপোরেট চাকরিজীবী—যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর এই প্রথাগত চাকরির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে দেশে বেকারত্বের হার ৪.৭ শতাংশ হলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও কঠিন। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে চাকরিদাতারা যখন ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছেন, তখন দেশের চাকরির বাজার আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
এই কঠিন বাস্তবতায় দেশের তরুণদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশা।
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের (OII) সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, অনলাইন শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। গ্লোবাল মার্কেটে বাংলাদেশের শ্রম শেয়ার ১৬ শতাংশ, যেখানে ২৪ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। এর মধ্যে কেবল আইটি (IT) খাতেই কাজ করছেন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার জন। বিগত বছরগুলোতে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, শুধুমাত্র এই আইটি খাত থেকেই ফ্রিল্যান্সাররা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় করছেন।
তথ্যের অভাব এবং যোগাযোগের ঘাটতি
ফ্রিল্যান্সিং খাতের এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পরও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সঠিক তথ্যের অভাব, আয়ের সুযোগ সম্পর্কে অস্বচ্ছতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সার, কন্টেন্ট রাইটার ও এসইও স্পেশালিস্ট ফয়সাল বিন ইকবাল মনে করেন, ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগের ঘাটতি দেশের ফ্রিল্যান্সারদের একটি বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন, “অনেকেরই দারুণ কাজ করার দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন স্কিল না থাকায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন।”
নতুনদের জন্য পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “শুরুতে আপওয়ার্ক (Upwork), ফাইভার (Fiverr) এবং পিপলপারআওয়ার (PeoplePerHour)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করা উচিত। এতে কাজের ধরন ও প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর অভিজ্ঞতা বাড়লে লিংকডইনে (LinkedIn) যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এখানে কাজ পাওয়া কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ পারিশ্রমিকের প্রজেক্ট এখানেই বেশি মেলে।”
লোডশেডিং ও ধীরগতির ইন্টারনেট এখনও বড় বাধা হলেও, ফয়সালের মতে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কর নিয়ে বিভ্রান্তি
ফ্রিল্যান্সিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (BFDS) চেয়ারম্যান ড. তানজিবা রহমান। চীনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “তারা বুঝতে পেরেছিল প্রথাগত জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিলে একসময় চাকরির তীব্র সংকট তৈরি হবে। তাই তারা দক্ষতাভিত্তিক (skill-oriented) শিক্ষায় মনোযোগ দিয়েছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।”
ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের ওপর কর প্রদান নিয়ে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর করে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “ফ্রিল্যান্সারদের কোনো ট্যাক্স বা কর দিতে হয় না। ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত। তবে এই সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক ফ্রিল্যান্সারের উচিত freelancers.gov.bd ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে সরকারি স্বীকৃতি নেওয়া।”
প্রতারণার ফাঁদ এবং এআই (AI)-এর অপরিহার্যতা
ফ্রিল্যান্সিংয়ের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র অনলাইনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় স্পনসরড পোস্টের মাধ্যমে ‘অল্প বিনিয়োগে রাতারাতি দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভের’ প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইন্টারনেটে আয়ের কোনো সুযোগ যদি ‘অবিশ্বাস্য রকম ভালো’ মনে হয়, তবে সেটি সাধারণত প্রতারণাই হয়ে থাকে। তাই কাজের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) টুলের উত্থান ফ্রিল্যান্সিংয়ের ধরন বদলে দিচ্ছে। এখন আর আগের দক্ষতায় আটকে থাকার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের দ্রুত এআই টুলের ব্যবহার শিখতে হবে এবং কাজের মান ও গতি বাড়াতে একে কাজে লাগাতে হবে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
প্রথাগত চাকরির বাইরে ফ্রিল্যান্সিং যে কতটা জীবন রক্ষাকারী হতে পারে, তার বড় প্রমাণ ১৭ বছর বয়সী আশরাফুল আলম সামি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সে মাত্র তিন মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় করে তার পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে।
সঠিক পরিবেশ ও নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘ফ্রিল্যান্সিং মেগা-পাওয়ার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ভারতের মতো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে, বৈশ্বিক আউটসোর্সিংয়ের মূল হাব হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।