বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এবং বৈশ্বিক রিমোট কাজের বাজারে দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, তরুণ জনশক্তি এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে এই খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। তবে ডিজিটাল অর্থনীতির এই অপার সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা বর্তমানে ভঙ্গুর অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
জুলাই ২০২৪-এর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও আকস্মিক সংকট
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের মতে, অনলাইন শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশব্যাপী ইন্টারনেট শাটডাউন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। টানা পাঁচ দিন ইন্টারনেট না থাকায় ফ্রিল্যান্সাররা ক্লায়েন্ট, কাজের ডেডলাইন এবং আয় থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
- খুলনার ফ্রিল্যান্সার সুদীপ্ত অপু জানান, তার ১,০০০ ডলারের বেশি মূল্যের আটটি চলতি প্রজেক্ট আটকে যায় এবং ফাইভার (Fiverr)-এ নেতিবাচক রিভিউয়ের কারণে তার প্রোফাইলের ভিজিবিলিটি কমে যায়। তার মাসিক আয় ১ লাখ টাকার বেশি থেকে কমে ৭০-৮০ হাজার টাকায় নেমে আসে।
- ক্লায়েন্টদের সাথে অমীমাংসিত বিরোধের কারণে শেখ আব্দুল্লাহর মতো অনেক ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্ট বাতিল হয়ে যায়, যা তাকে ফ্রিল্যান্সিং ছেড়ে স্থানীয় চাকরিতে যোগ দিতে বাধ্য করে।
ফাইভার সাময়িকভাবে ‘ভ্যাকেশন মোড’ চালু করে ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করলেও তা অনেকের জন্যই যথেষ্ট ছিল না।
দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত বাধা এবং উচ্চ ফি
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ফ্রিল্যান্সারদের দুর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী কিছু কাঠামোগত সমস্যাও সামনে এনেছে:
- নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং বিদ্যুতের অভাব বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং সম্প্রদায়কে দীর্ঘদিন ধরে ভোগাচ্ছে।
- ফাইভার বা আপওয়ার্কের (Upwork) মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত কমিশন কেটে নেয়, যা ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের বড় একটি অংশ নিয়ে যায়। শপিফাই ডেভেলপার সুমাইয়া ইসলামের মতে, প্ল্যাটফর্মের বাইরে সরাসরি ক্লায়েন্ট পাওয়া প্রতিটি ফ্রিল্যান্সারের স্বপ্ন হলেও, এর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নেটওয়ার্কের অভাব রয়েছে।
দক্ষতার ঘাটতি: কী বলছে এনএসডিএ-এর প্রতিবেদন?
অক্টোবর ২০২৪ সালে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-এর প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সারই তরুণ ও শহুরে পুরুষ, যাদের কাজের অভিজ্ঞতা তিন বছরেরও কম।
- ফ্রিল্যান্সাররা গ্রাফিক ডিজাইনের মতো কাজে পারদর্শী হলেও প্রোগ্রামিং বা সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চমূল্যের (High-value) দক্ষতায় প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে আছেন।
- এই দক্ষতার ঘাটতির কারণেই সিইও ম্যাগাজিনের (CEO Magazine) শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ২৯তম স্থানে নেমে এসেছে।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, গতানুগতিক ডেটা এন্ট্রি, গ্রাফিক ডিজাইন বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বাইরে গিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং (ML), সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং এবং থ্রিডি (3-D) মডেলিংয়ের মতো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরণের উপায় ও ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর নতুন সম্ভাবনা
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- বিদেশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (যেমন: স্টারলিংক)-কে বাংলাদেশে পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য একটি বড় আশার আলো।
- যে ফ্রিল্যান্সাররা মার্কেটপ্লেসের বাইরে নিজেদের ক্লায়েন্ট তৈরি করেছিলেন, তারা ইন্টারনেট বন্ধের সময়টাতেও অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাই আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম বা সমবায় (Co-operatives) গড়ে তোলার প্রতি জোর দেওয়া হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং আর্থিক স্বাধীনতা ও বৈশ্বিক সুযোগের একটি বড় মাধ্যম। অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করে এবং সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষ করে তুলতে পারলে এই ‘বাংলাদেশ ২.০’ যুগে গ্লোবাল ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা কেবল টিকেই থাকবেন না, বরং আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।
Leave a Reply