এক্সক্লুসিভ: এআই দিয়ে চাকরি প্রতিস্থাপন ঘটছে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে—নতুন গবেষণা
জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মূলত কম জটিল ও একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করছে, তবে একই সঙ্গে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদাও দ্রুত বাড়াচ্ছে। বিশ্বখ্যাত ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ‘আপওয়ার্ক’ (Upwork)-এর এক এক্সক্লুসিভ গবেষণার ভিত্তিতে প্রাপ্ত নতুন তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বাস্তব চিত্র ও আয়ের সমীকরণ
এআই প্রযুক্তি গণহারে চাকরি কাড়বে—এমন অনেক সতর্কবার্তা থাকলেও আপওয়ার্কের তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। বাস্তবে অনেক কর্মী কাজের সুযোগ বাড়াতে এবং পারিশ্রমিক উন্নত করতে জেনারেটিভ এআইকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে এআই-সংক্রান্ত কাজ থেকে ফ্রিল্যান্সারদের আয় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া এআই-সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত ফ্রিল্যান্সাররা সাধারণ কাজের তুলনায় ঘণ্টায় ৪০ শতাংশেরও বেশি আয় করছেন।
আপওয়ার্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেলি মোনাহান জানান, পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকা পেশাজীবীরা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রথাগত মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ বা এআই ভিডিও-ইমেজ টুল ব্যবহারকারী গ্রাফিক ডিজাইনাররা তাদের স্বাভাবিক কাজের পরিধি বাড়িয়ে বাড়তি প্রিমিয়াম আয় করছেন।
স্বয়ংক্রিয়তার চেয়ে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এখনো সম্পূর্ণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো কাজ এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিতে ভরসা পাচ্ছেন না। আপওয়ার্কের তথ্য বলছে, একাকী এআই-এর ফলাফলের চেয়ে মানুষের নিজস্ব কাজ এবং মানুষ ও এআই-এর যৌথ কাজের প্রতি প্রতিষ্ঠানের আস্থা ক্রমেই বাড়ছে। সম্পূর্ণ ‘অটোমেশন’ বা স্বয়ংক্রিয় করার চেয়ে এআইকে ‘অগমেন্টেশন’ বা কাজের সহায়তায় ব্যবহার করার অনুপাত ২:১-এরও বেশি।
কোডিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাহিদা কমলেও জটিল প্রজেক্টের জন্য অভিজ্ঞ ডেভলপারদের কদর কমেনি। কোডিং সম্পর্কিত কাজ করা ফ্রিল্যান্সাররা ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি চালুর সময়ের চেয়ে বর্তমানে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। এছাড়া কোডিং না জেনেও এআই টুলের মাধ্যমে প্রোগ্রামিং করার ‘ভাইব কোডিং’ (Vibe coding) প্রবণতার ফলে ‘জেনারেলিস্ট’ ধারার নতুন এক ধরণের বহুমুখী কর্মীবাহিনীর চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
বাধা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
কর্মক্ষেত্রে এআই গ্রহণের পথটি পুরোপুরি মসৃণ নয়। প্রতিষ্ঠানের নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেক কর্মী গোপনে নিজস্ব এআই টুল ব্যবহার করছেন। সম্প্রতি ডিউক ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সুবিধার্থে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারকারী কর্মীদের দক্ষতা ও কাজের অনুপ্রেরণা নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে এক ধরণের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে এআই প্রযুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সম্প্রতি ‘ইকোনমিক ফিউচার্স প্রোগ্রাম’ চালু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা সংস্থা অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)। সংস্থাটির সিইও দারিও আমোদেই আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এন্ট্রি-লেভেলের হোয়াইট-কলার চাকরি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করলেও, এআই-এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব অনুধাবনে তারা বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ওপর জোর দিচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, এআই নির্দিষ্ট কিছু প্রাথমিক পদ প্রতিস্থাপন করলেও, মানুষের কাজের পরিধি বাড়াতে ও নতুন ধাঁচের কর্মসংস্থান তৈরিতে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
জেনারেটিভ এআই মূলত কম জটিল ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করছে, তবে একই সঙ্গে এআই-সংক্রান্ত চাকরির চাহিদাও বাড়াচ্ছে। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ‘আপওয়ার্ক’-এর নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
- সারসংক্ষেপ: চাকরির বাজার নিয়ে জল্পনা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কর্মীরা কাজ পাওয়ার সুযোগ ও বেতন বাড়াতে এআই ব্যবহার করছেন। প্রতিষ্ঠানের সিইওরা সম্পূর্ণ জ্ঞানভিত্তিক কর্মী নিয়োগে ইতস্তত করলেও এআই দিয়ে কাজ বাড়ানো কর্মীদের প্রাধান্য দিচ্ছেন।
- পরিসংখ্যান ও আয়: আপওয়ার্কের তথ্য মতে, এআই-সংক্রান্ত ফ্রিল্যান্স আয় এক বছরে ২৫% বেড়েছে। নন-এআই কাজের চেয়ে এআই-সম্পর্কিত কাজে ফ্রিল্যান্সাররা ঘণ্টায় ৪০% বেশি আয় করছেন।
- দক্ষতার প্রভাব: এআই দিয়ে হুট করে নতুন কেউ নয়, বরং যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে (যেমন: মেশিন লার্নিং বা গ্রাফিক ডিজাইন), তারাই এআই ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন।
- মানুষের প্রতি আস্থা: বিজনেস লিডাররা এখনো মানুষ ছাড়া একা এআইকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কেবল এআই-ভিত্তিক ফলাফলের চেয়ে মানুষের তৈরি বা মানুষ-এআই যৌথ কাজের প্রতি আস্থা দিন দিন বাড়ছে। অটোমেশনের চেয়ে কাজের সহায়তায় এআই ব্যবহারের অনুপাত ২:১-এরও বেশি।
- কোডিং ও ‘জেনারেলিস্ট’ ধারার উত্থান: সাধারণ কোডিংয়ের চাহিদা কমলেও জটিল প্রজেক্টের জন্য অভিজ্ঞ ডেভলপারদের চাহিদা অপরিবর্তিত। কোড না জেনেও এআই দিয়ে কোড করার ‘ভাইব কোডিং’ নতুন এক ধরণের ‘জেনারেলিস্ট’ (যারা কোডিং ও ডিজাইন উভয়ই এআই দিয়ে চালাতে পারেন) কর্মীর চাহিদা তৈরি করছে।
- অন্যান্য পর্যবেক্ষণ: অনেক ক্ষেত্রে কর্মী ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে এআই ব্যবহারে মানসিক বাধা ও নীতিগত অস্পষ্টতা রয়েছে। এআইয়ের পূর্ণ অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে অ্যানথ্রোপিক সম্প্রতি ‘ইকোনমিক ফিউচার্স প্রোগ্রাম’ চালু করেছে।
মূল কথা হলো—এআই কিছু প্রাথমিক ও একঘেয়ে কাজ প্রতিস্থাপন করলেও, মানুষ এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করে আরও নতুন ধরণের কাজ ও সুযোগ তৈরি করছে।
Leave a Reply