জন্ম থেকেই তাঁর দুটি হাত নেই, চলাফেরার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যও মেলেনি। তবে শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়েছে তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস। দুই পায়ের আঙুলে কলম উঁচিয়ে লিখে একে একে সব ধাপ পেরিয়ে সম্পন্ন করেছেন স্নাতকোত্তর (এমবিএ)। এখানেই শেষ নয়; ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা। সংগ্রামী ও অদম্য এই তরুণের নাম মো. আলী (২৬)। তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের হরিদার ঘোনা গ্রামের সন্তান।
একনজরে মো. আলীর জীবন সংগ্রাম
| বিষয় | বিবরণ |
| নাম ও বয়স | মো. আলী (২৬) |
| স্থায়ী ঠিকানা | হরিদার ঘোনা, বড়হাতিয়া, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম |
| পিতা-মাতা | আমিন শরীফ (ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী) ও শামসুন্নাহার (গৃহিণী) |
| সর্বশেষ শিক্ষা | এমবিএ (ব্যবস্থাপনা), চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ |
| পেশাগত পরিচিতি | অনলাইন ফ্রিল্যান্সার (মোট আয় প্রায় ৬,০০০ মার্কিন ডলার) |
| বর্তমান প্রত্যাশা | দেশের সেবায় যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি |
প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিন শরীফ ও গৃহিণী শামসুন্নাহারের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে আলী সবার ছোট। স্থানীয় বি জি সেনেরহাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে মোস্তাফিজুর রহমান ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর সাতকানিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০২৪ সালে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শেষ করে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
নিজের সব কাজ পায়ে করার অভ্যাসে অভ্যস্ত আলী লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়াসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো অন্যের সাহায্য ছাড়াই সামলে নেন।
কম্পিউটার উপহার থেকে ফ্রিল্যান্সিং সাফল্য
২০১৭ সালে আলীর অদম্য ইচ্ছা দেখে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁকে একটি কম্পিউটার উপহার দেন। করোনাভাইরাসের মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে সেই কম্পিউটারকে হাতিয়ার করে অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন আলী।
- প্রথম আয়: ২০২১ সালে ফ্রিল্যান্সিং থেকে তাঁর প্রথম উপার্জন আসে ৯ হাজার টাকা।
- বর্তমান অবস্থান: অদম্য পরিশ্রমে কাজের পরিধি বাড়িয়ে এ পর্যন্ত তিনি অনলাইন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার অর্জন করেছেন।
- পারিবারিক ভূমিকা: কাজের পাশাপাশি সুযোগ পেলেই বাবার ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহযোগিতা করেন আলী।
স্বপ্নের সরকারি চাকরি ও সার্বিক মূল্যায়ন
নিজের অর্জন ও আত্মনির্ভরশীলতার পথ পেরিয়ে আলী এখন চান দেশের সেবা করতে। উচ্চশিক্ষার মর্যাদা হিসেবে একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশা তাঁর।
“আমার জীবনে মা–বাবা, শিক্ষক ও বন্ধুদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। তাঁরা কখনো আমাকে বোঝা মনে করেননি। যোগ্যতানুযায়ী একটি সরকারি চাকরি পেলে সমাজ ও দেশের মানুষের সেবা করে সেই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব।”
— মো. আলী
আলীর বাবা আমিন শরীফ জানান, ছেলে সব সময় নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করে এবং কারও ওপর বোঝা হতে চায় না। সরকার যেন তাঁর সন্তানের স্বপ্নের চাকরিটির ব্যবস্থা করে, সেই আকুতি জানান তিনি।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম আলীর এই অনন্য কৃতিত্বের প্রশংসা করে জানান, “দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও আলী যেভাবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে ইচ্ছাশক্তির কাছে বাধা হতে পারে না, মো. আলী আজ দেশের হাজারো তরুণ-তরুণীর কাছে তার এক বাস্তব দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply