২০১৭ সালে বিকেলের এক ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দিয়েছিল তরুণ আবদুল বাছেদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। স্পাইনাল কর্ডে মারাত্মক আঘাত পেয়ে অবশ হয়ে যায় দুই পা, চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে হুইলচেয়ার। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে পরাজয় হিসেবে মেনে না নিয়ে তিনি ধৈর্য, অদম্য ইচ্ছা ও পরিশ্রম দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আজ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি মাসে আয় করছেন ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।
সংক্ষেপে বাছেদের অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নাম | আবদুল বাছেদ |
| গ্রামের বাড়ি | দাগনভূঞা, নোয়াখালী |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | বিএসএস (স্নাতক), ফেনী সরকারি কলেজ (২০২৩) |
| দক্ষতার ক্ষেত্র | গুগল অ্যাডস, গুগল মার্চেন্ট সেন্টার ও কনভার্সন ট্র্যাকিং |
| মার্কেটপ্লেস | ফাইভআর (Fiverr) ও আপওয়ার্ক (Upwork) |
| বর্তমান মাসিক আয় | ১,০০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা |
| স্বীকৃতি | সরকারি রেমিট্যান্স সনদপ্রাপ্ত সার্টিফায়েড প্রফেশনাল |
দুর্ঘটনার আঘাত ও পরিবারের সমর্থন
নোয়াখালীর দাগনভূঞার আতাতুর্ক মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরবর্তীতে বিজ্ঞান বিভাগে ২০১৫ সালে এসএসসি সম্পন্ন করেন বাছেদ। ২০১৮ সালে চৌমুহনী সরকারি এসএ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার আগে দুর্ঘটনাটির শিকার হন তিনি। এতে তাঁর জীবনের একটি বছর হাসপাতালের বিছানায় কেটে গেলেও পড়াশোনা থামাননি; শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে ২০২৩ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
এই দীর্ঘ সংগ্রামে বাছেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর পরিবার:
- বাবা সাহাব উদ্দিন: দীর্ঘকাল প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সন্তানের ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি গড়ে দেন।
- মা সেতারা আক্তার: পরম মমতায় ও ভালোবাসায় সব সময় বাছেদকে ছায়া দিয়ে গেছেন।
- ভাই-বোন: সৌদি প্রবাসী বড় ভাই ইমরান হোসেন, ছোট ভাই আবু জাফর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছোট বোন হেবা বিনতে সাহাব—সবাই বাছেদের এই পথচলায় অসামান্য অনুপ্রেরণা ও সমর্থন জুগিয়েছেন।
অবকাঠামোগত বাধা ও নতুন দিগন্তের সন্ধান
স্নাতক শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের চেষ্টা করতেই বাছেদ মুখোমুখি হন কঠোর বাস্তবতার। দেশের অধিকাংশ অফিস ভবন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য সহজগম্য নয়। সামান্য বেতনের চাকরির জন্যও প্রতিদিন যাতায়াতের যে কঠিন অবকাঠামোগত শারীরিক চ্যালেঞ্জ, তা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। ঘরের চারদেয়ালে নিজেকে বন্দি না রেখে গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
প্রযুক্তির হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর ধাপসমূহ:
- প্রারম্ভিক প্রশিক্ষণ: পরিবারের কাছে আবদার করে পাওয়া কম্পিউটারে শুরুতে সময় কাটলেও পরে চট্টগ্রামের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন।
- দক্ষতা নির্বাচন: শপিফাই ও ওয়ার্ডপ্রেস শেখার চেষ্টা করলেও ২০২১ সালের শেষভাগে মেন্টর শামীম হুসাইনের (স্কিলআপার) দিকনির্দেশনায় গুগল অ্যাডস ও গুগল মার্চেন্ট সেন্টারে নিজেকে প্রস্তুত করেন।
- আন্তর্জাতিক বাজারে সফলতা: ফাইভআর ও আপওয়ার্কে নিখুঁত কাজের মাধ্যমে দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ক্লায়েন্টদের আস্থা অর্জন করেন। অ্যাডভান্সড গুগল অ্যাডস ও কনভার্সন ট্র্যাকিং শিখে পুরোনো ক্লায়েন্টদের দীর্ঘমেয়াদী সেবা দিতে শুরু করেন।
দেশের অর্থনীতিতে অবদান ও প্রাপ্তি
আজ আবদুল বাছেদ কেবল একজন সফল স্বাবলম্বী তরুণ নন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা একজন গর্বিত ‘রেমিট্যান্স-যোদ্ধা’। নিজের ঘরে বসেই তিনি নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন এবং কর পরিশোধ করছেন। অর্জন করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রেমিট্যান্স সনদ।
“আমি আমার জীবন নিয়ে অনেক খুশি। জীবন নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে বেঁচে আছি।”
— আবদুল বাছেদ
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে শারীরিক যেকোনো সীমাবদ্ধতা যে অগ্রযাত্রার বাধা হতে পারে না—আবদুল বাছেদের এ সাফল্য তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply