বিশ্বজুড়ে কাজের ধরন ও ধারণায় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। ঐতিহ্যগত নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার চাকরির স্থান দখল করে নিচ্ছে আধুনিক, নমনীয় ও চাহিদানুযায়ী কাজের ব্যবস্থা—যা ‘গিগ ইকোনমি’ (Gig Economy) নামে পরিচিত।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নিরবচ্ছিন্ন অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই রূপান্তর একদিকে যেমন মানুষের উপার্জনের মাধ্যম বদলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনায় আনছে নতুন গতিশীলতা।উদ্বৃত্ত তরুণ জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশের গিগ ইকোনমি
| খাত / সূচক | বর্তমান চিত্র ও উপাত্ত |
| বৈশ্বিক শ্রম বাজারে অবস্থান | অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ সরবরাহকারী (১৬% মার্কেট শেয়ার) |
| সক্রিয় বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সার | প্রায় ৬,৫০,০০০ জন |
| ডিজিটাল সেবা থেকে বার্ষিক বৈদেশিক আয় | ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বেশি |
| অভ্যন্তরীণ গিগ ইকোনমিতে কর্মসংস্থান | রাইড-শেয়ারিং, ডেলিভারি ও অ্যাপভিত্তিক সেবায় ১০ লক্ষাধিক তরুণ |
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান
বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়ে গিগ ইকোনমির বিস্তার ঘটেছে অভাবনীয় গতিতে। আপওয়ার্ক, ফাইভার কিংবা উবারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সেবা আদান-প্রদান করছেন।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ দেশ, যা মোট বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ১৬ শতাংশ দখল করে আছে। প্রায় সাড়ে ৬ লাখ সক্রিয় অনলাইন ফ্রিল্যান্সারের মাধ্যমে প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে অর্ধাংশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রপ্তানি বহুমুখীকরণে এটি অন্যতম অ-ঐতিহ্যবাহী প্রতিশ্রুতিশীল খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
অভ্যন্তরীণ বাজার ও নতুন কর্মসংস্থান
শুধু আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিংয়েই নয়, দেশের অভ্যন্তরেও গিগ ইকোনমির পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে:
- রাইড-শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা:রাইড-শেয়ারিং এবং অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের শহরাঞ্চলের লাখ লাখ তরুণের জন্য আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
- ডিজিটাল কমার্স (F-Commerce):ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে ছোট ছোট ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতি বছর প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম যুবকের সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করা যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে গিগ ইকোনমি বিকল্প অর্থনৈতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে।
গিগ ইকোনমির সুবিধা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ
ডিজিটাল কাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর সহজগম্যতা। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অপেক্ষা প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখানে আয়ের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে। তবে এই সম্ভাবনাময় খাতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান:
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:
- আয়ের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সুরক্ষা: নির্দিষ্ট মেয়াদের চাকরি না হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তার অভাব।
- আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও এআই (AI): প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিরবচ্ছিন্ন দক্ষতা উন্নয়নের চাপ।
- নারী অংশগ্রহণে বাধা: সামাজিক ও কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কম।
সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহারে করণীয়
বাংলাদেশে গিগ ইকোনমিকে সুসংগঠিত ও টেকসই খাতে রূপান্তর করতে হলে নীতিগত ও অবকাঠামোগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
- নীতিগত স্বীকৃতি ও সুরক্ষা:আইনি কাঠামোতে গিগ ওয়ার্কারদের স্বীকৃতি প্রদান ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
- উচ্চমানের দক্ষতা উন্নয়ন:সাধারণ ডাটা এন্ট্রি বা প্রাথমিক নকশা থেকে বেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো উচ্চমূল্যের কাজে জোর দেওয়া।
- সহজ আর্থিক লেনদেন: আন্তর্জাতিক উপার্জিত অর্থ সহজে ও কম খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- ব্র্যান্ডিং: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষ ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরা।
সঠিক পলিসি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারলে এই গিগ ইকোনমিই হবে আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
Leave a Reply