🇧🇩 A National Initiative — Empowering Bangladesh's Global Workforce
Technology

নাশতার টাকা বাঁচিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে মাসে ১০ লাখ

June 30, 2026 · First Bangladesh

পিরোজপুরের তরুণ ইমতিয়াজ আহমদ। পড়াশোনা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানলেও কখনো ভাবেননি, এটিই হবে তাঁর পেশা। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ঘরে বসে নিজের চেষ্টায় শেখা শুরু করেছিলেন। সেই শেখাই আজ তাঁকে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বর্তমানে পিরোজপুরে বসেই মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি। শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি; তাঁর হাত ধরে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন ২০ তরুণ।

করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িতে ফিরে আসেন ইমতিয়াজ। দীর্ঘ সময় ঘরে বসে থাকতে থাকতে নিজ উদ্যোগে অনলাইন মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। বিভিন্ন কাজের জন্য আবেদন করতে থাকেন। প্রথম সপ্তাহেই একটি কাজ পেয়ে যান। কিন্তু কাজটির অনেক কিছুই তখন তাঁর জানা ছিল না। ইউটিউব দেখে দেখে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করেন। কাজ দেখে সন্তুষ্ট হন গ্রাহক (ক্লায়েন্ট)। প্রথম কাজের সেই সফলতাই তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

নিজে নিজে শেখার আগ্রহই ছিল ইমতিয়াজের সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিবার থেকে প্রতিদিন নাশতার জন্য ৫০ টাকা পেতেন। সেই টাকা জমিয়ে ইন্টারনেট ডাটা কিনতেন। ইউটিউব থেকেই ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে একজন বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঘণ্টাপ্রতি ১০০ টাকা পারিশ্রমিকে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। ইমতিয়াজ বলেন, ‘প্রথম দিকে অনেক রাত জেগে কাজ করেছি। আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পরপর অ্যালার্ম দিয়ে রাখতাম, যাতে কোনো ক্লায়েন্টের বার্তার উত্তর দিতে দেরি না হয়। তখন কখনো ভাবিনি, এই কাজই একদিন আমার ক্যারিয়ার হবে।’

নিজে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একা এগিয়ে যেতে চাননি ইমতিয়াজ। এলাকার ছোট ভাই অর্ণবকে ফ্রিল্যান্সিং শেখাতে শুরু করেন। পরে একে একে যুক্ত হন হিমাদ্রি দাস, রেসাদ, বিপ্লব ও মুন। এই পাঁচ তরুণকে নিয়েই শুরু হয় তাঁর পথচলা। সময়ের সঙ্গে সেই টিম বড় হয়েছে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন ২০ তরুণ। তাঁদের মধ্যে অর্ণব, হিমাদ্রি ও রেসাদ ইতিমধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন। অর্ণব বলেন, ‘ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের হাতেখড়ি। শুরুতে তিনি শুধু কাজই শেখাননি, শেখার সময় সাহস ও উৎসাহও দিয়েছেন। এখন নিজে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে স্বাধীনভাবে কাজ করছি।’

মফস্‌সল শহরে বসে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও ভালো ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে ইমতিয়াজকে। তবু পিরোজপুর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাননি। তাঁর ইচ্ছা, নিজের জেলাতেই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই মূলত কাজ করেন ইমতিয়াজ। বর্তমানে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বিদেশি ক্লায়েন্টরা সব সময় শেখার সুযোগ দিয়েছেন, কখনো নিরুৎসাহিত করেননি।

নিজের পরিশ্রমের ফলে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে ইমতিয়াজের জীবন। নিজের উপার্জনের অর্থে বাবার চিকিৎসা করিয়েছেন। পরিবারকে নিয়ে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল, কাশ্মীর, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। সম্প্রতি প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাটও বুকিং দিয়েছেন। প্রতিবছর আয়ের একটি অংশ মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও স্থানীয় খেলাধুলার উন্নয়নে ব্যয় করেন। ইমতিয়াজের বাবা আবদুর রকিব বলেন, ‘শুরুর দিকে ও (ইমতিয়াজ) কী কাজ করে, তা ঠিক বুঝতাম না। এখন ছেলের সাফল্যে খুব ভালো লাগে।’

নতুনদের জন্য ইমতিয়াজের পরামর্শ, নিজে নিজে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। ক্লায়েন্টের সঙ্গে পেশাদার, স্বচ্ছ ও আন্তরিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারলে তাঁদের আস্থা অর্জন করা সহজ হয়। আর সেই আস্থাই দীর্ঘমেয়াদি কাজের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান ২০ জনের দলকে ২০০ জনে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখছেন ইমতিয়াজ আহমদ। তাঁর বিশ্বাস, দক্ষতা ও অধ্যবসায় থাকলে পিরোজপুরের মতো জেলা শহর থেকেও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *