
অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হয়ে আইটি, ডিজাইন এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে দেশের তরুণরা নতুন সুযোগ তৈরি করছেন। তবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে (GVC) যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এই পেশায় আয়-অনিশ্চয়তা, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব ফ্রিল্যান্সারদের এক ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
অর্থনৈতিক অবদান ও প্রবৃদ্ধির চিত্র
বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্রিল্যান্সিং একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার হয়ে উঠেছে। গবেষণাপত্রটির তথ্যমতে:
- আইসিটি বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন এবং এই খাতের বাজারমূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
- অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
- বাংলাদেশের ৯৬.২% ফ্রিল্যান্সারের বয়স ৩৫ বছরের নিচে এবং ৮০.৮% ফ্রিল্যান্সার উচ্চশিক্ষিত, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
- ২০২২ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর তথ্যমতে, আইটি ও সফটওয়্যার আউটসোর্সিং থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার।
শ্রমের নাজুকতা ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ
ফ্রিল্যান্সিং বড় ধরনের অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি করলেও, এর সাথে যুক্ত থাকা নাজুক দিকগুলো এই পেশার স্থায়িত্বকে হুমকিতে ফেলছে:
- প্রায় ৪৮.১% ফ্রিল্যান্সার মাসে ২৫,০০০ টাকা (২০৯ ইউএসডি) পর্যন্ত আয় করেন।
- গার্মেন্টস খাতের ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকার তুলনায় এই আয় বেশি হলেও শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য এটি অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয় এবং আয়ের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
- বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যবীমা, সবেতন ছুটি বা পেনশনের মতো আইনি বা আনুষ্ঠানিক শ্রম সুরক্ষা নেই।
- ৫৯.৬% ফ্রিল্যান্সার জানিয়েছেন তাদের প্রথাগত ইংরেজি শিক্ষার অভাব রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
- প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এবং রেটিং সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ফ্রিল্যান্সারদের রেটিং ধরে রাখতে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম পারিশ্রমিকেও কাজ করতে হয়, যা এক ধরণের বৈশ্বিক শোষণের পরিবেশ তৈরি করে।
লিঙ্গবৈষম্যের প্রকট রূপ
ফ্রিল্যান্সিং খাতে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত হতাশাজনক।
- গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে ৯২.৩ শতাংশই পুরুষ।
- প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল দক্ষতার অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা এই বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল পাওয়া থেকে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উন্নত দেশগুলোর সাথে পার্থক্য
উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।
- যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রিল্যান্সারদের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ৭৫,০০০ ডলার এবং তারা উন্নত সামাজিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত।
- অন্যদিকে, ডেভিড হার্ভের ‘নিওলিবারেলিজম’ এবং ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের ‘ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস থিওরি’-এর আলোকে দেখা যায়, বাংলাদেশ গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে যুক্ত হলেও সস্তা শ্রমের কারণে বৈশ্বিক বৈষম্য ও শোষণের শিকার হচ্ছে।
- বন্দনা শিবার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্বায়নের নামে উন্নত দেশগুলো সস্তায় কাজ করিয়ে নিলেও উন্নয়নশীল দেশের কর্মীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
উত্তরণের উপায়
গবেষণাপত্রটির উপসংহারে বলা হয়েছে যে, ফ্রিল্যান্সিং খাতের এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় অবিলম্বে নীতিনির্ধারণী সংস্কার প্রয়োজন। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর (regulatory frameworks) বিকল্প নেই। অন্যথায়, এটি কেবল সস্তা শ্রমের একটি বৈশ্বিক বাজার হিসেবেই থেকে যাবে।