A National Initiative — Empowering Bangladesh's Global Workforce
Technology

এআই বিপ্লবের নেপথ্যে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। চ্যাটজিপিটি বা মেটা’র মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) মুহূর্তের মধ্যে জটিল ইমেইল লেখা, প্রোগ্রামিং কোড প্রস্তুত কিংবা ভিডিও তৈরির মতো কাজ অবলীলায় সম্পন্ন করছে। তবে এআই-এর প্রতিটি নিখুঁত ও নিরাপদ উত্তরের নেপথ্যে কাজ করছেন রক্ত-মাংসের মানুষ, যাদের বলা হচ্ছে ‘ডেটা অ্যানোটেটর’ (Data Annotator) বা ‘এআই ট্রেইনার’ (AI Trainer)। বিশ্বজুড়ে এআই মডেলের এই যাচাইকরণ ও ভুল সংশোধনের বিশাল কর্মযজ্ঞে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা।

ডেটা অ্যানোটেটরের কাজ ও প্রক্রিয়ার স্বরূপ

এআই ট্রেইনারদের প্রধান কাজ হলো এআই মডেলগুলোকে সঠিক ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, উত্তরের মান নির্ধারণ করা এবং ক্ষতিকর বা নীতিবিরুদ্ধ তথ্য অপসারণ নিশ্চিত করা।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেটার (Meta) ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাওসিফ নিলয় নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন:

“আমি মূলত নির্দিষ্ট কিছু প্রম্পট বা নির্দেশনার সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে ডেটা লেবেলিং করতাম। এআই মডেলগুলো যাতে কোনো ক্ষতিকর বা অনৈতিক উত্তর না দেয়, সে জন্য ‘রেড-টিমিং’ (Red-Teaming) বা মডেল টেস্টিং করা হতো। এতে কোড ইনজেকশন কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে এআই-কে বিভ্রান্ত করে এর সহনশীলতা পরীক্ষা করতে হতো।”

এছাড়াও ছবি ও অডিও ট্যাগিং এবং চ্যাটবটের উত্তর ক্রমানুসারে সাজানোর মতো কাজের মাধ্যমে এআই শেখে মানুষ কোন ধরনের ভাষা ও তথ্য পছন্দ করে। হাজার হাজার মানুষের টানা সংশোধনের ফলেই আজকের এআই মানুষের মতো সাবলীল ভাষায় উত্তর দিতে সক্ষম হচ্ছে।

ডেটা অ্যানোটেশনের বৈশ্বিক বাজার ও বাংলাদেশের অবস্থান

গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্রেটস রিসার্চ’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ডেটা অ্যানোটেশন টুলের বৈশ্বিক বাজার ছিল প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এআই প্রশিক্ষণের কাজের সাথে যুক্ত।

সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র:
• বাংলাদেশের মোট ফ্রিল্যান্সার: প্রায় ৬.৫ লাখ (সরকারি তথ্য)
• অর্থনীতিতে বার্ষিক অবদান: আনুমানিক ৭২৫ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫ অর্থবছর)
• বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে অংশ: প্রায় ১৫ শতাংশ (২০২১ সালের তথ্য)
• ডেটা অ্যানোটেশনের বিশ্ব বাজার: ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার (২০২৫) ➔ ৩০ বিলিয়ন ডলার (২০৩৪ প্রাক্কলন)

বিপিও খাতের সাথে তুলনা ও অটোমেশনের ঝুঁকি

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং কম্পিউটার ভিশন ও এনএলপি বিশেষজ্ঞ ড. নাবিল মোহাম্মদ বাংলাদেশের এই নতুন এআই প্রশিক্ষণ শিল্পকে বিপিও (BPO) খাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ড. নাবিল মোহাম্মদের মতে, “এআই ডেটার কাজ অনেকটা আগের বিপিও খাতের মতোই—যেখানে কম খরচে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো করা হয়। তবে এআই নিয়ে কাজ করতে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। আমরা যদি এই অভিজ্ঞতাকে উচ্চমানের আউটপুট তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারি, তবে এটি স্রেফ আউটসোর্সিংয়ের আরেকটি জোয়ার হয়েই থেকে যাবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এআই-এর দ্রুত উন্নতির ফলে বর্তমানে মানুষ যেসব সাধারণ কাজ করছে, অদূর ভবিষ্যতে এআই নিজেই তা করতে সক্ষম হবে। ফলে উচ্চতর দক্ষতা অর্জন না করলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী হঠাৎ কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মজুরি বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য

সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে বৈষম্যের চিত্রও স্পষ্ট। ২০২৫ সালে ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অ্যানোটেশনের জন্য আউটসোর্সিং ফার্মগুলোকে ঘণ্টায় ১২.৫০ ডলার পর্যন্ত দিলেও কেনিয়া বা বাংলাদেশের কর্মীরা পান মাত্র ২ ডলার।

এছাড়াও, সাধারণ লেবেলিং ও রেটিংয়ের কাজগুলোতে কর্মীদের সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় বলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকে, যা মজুরিকে নিম্নমুখী রাখে। পক্ষান্তরে, ‘রেড-টিমিং’ বা নীতি নির্ধারণী (Policy Making) কাজের মতো উচ্চস্তরের কাজে আয় অনেক বেশি এবং তা অটোমেশনের ঝুঁকিমুক্ত।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ার সম্ভাবনা

ডেটা অ্যানোটেশন খাতটি কি দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে:

  • ইতিবাচক দিক: তাওসিফ নিলয় জানান, দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারলে এই খাত থেকে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর কিংবা পলিসি মেকিং টিমে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।
  • নেতিবাচক দিক: ফারদিন জারিফ নামে একজন সাবেক এআই অ্যানোটটর জানান, পদোন্নতির আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান আকস্মিক কর্মী ছাঁটাই করে, ফলে ক্যারিয়ারের স্থায়ী উন্নতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

জাতীয় কৌশল ও ভবিষ্যতের পথরেখা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ কেবল এআই-এর ‘ভোক্তা’ বা ‘নিম্ন-মজুরির ট্রেইনার’ হয়ে থাকলে চলবে না, বরং এআই ‘সরবরাহকারী’ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা যাতে শুধু সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে আটকে না থেকে এআই সাপ্লাই চেইনের উচ্চপর্যায়ে প্রবেশ করতে পারেন, সে জন্য সঠিক জাতীয় নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্যাপক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep reading

Related articles

Technology February 19, 2025 1 min read

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত: সম্ভাবনা, সংকট এবং উত্তরণের উপায়

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এবং বৈশ্বিক রিমোট কাজের বাজারে দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।…

Technology August 13, 2026 1 min read

শীর্ষস্থানীয় ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে AI ভিত্তিক দক্ষতার রেকর্ড চাহিদা তৈরি হয়েছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) কর্মসংস্থানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে—এমন আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি এটি ফ্রিল্যান্সার এবং তাঁদের নিয়োগকারী…

Technology July 14, 2026 1 min read

সৈনিক থেকে সফল ফ্রিল্যান্সার মুহাইমিনুল, মাসে আয় ৩ লাখ টাকা

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মুহাইমিনুল ইসলাম। একসময় পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিল তাঁর ১৬ হাজার টাকার সরকারি চাকরি। কম্পিউটার অন-অফ…