
বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই নতুন কিছু শুরু করা যায়—তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফেরদৌস জাহান। মেয়েকে ফ্রিল্যান্সিং শেখাতে গিয়ে নিজেই আজ হয়ে উঠেছেন একজন সফল ফ্রিল্যান্সার। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী এখন কেবল অনলাইনেই আয় করছেন না, বরং একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
যেভাবে শুরু এই পথচলার
গল্পের শুরু ২০১৯ সালের দিকে। একটি পত্রিকায় বিনা মূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হন গৃহিণী ফেরদৌস জাহান। ঘরে বসে আয়ের সুযোগটি তাঁর মনোযোগ কাড়লেও, কম্পিউটারে তাঁর কোনো দক্ষতা ছিল না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়ে নওরিন খানকে এই বিষয়ে উৎসাহিত করেন তিনি।
বিনা মূল্যের সেই কর্মশালায় অংশ নিতে মা-মেয়ে দুজনেই উপস্থিত হন ‘ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট’-এ। সেখানে গিয়ে ফেরদৌস জাহান অবাক হয়ে দেখেন, কেবল তরুণরাই নয়, ৬০-৬৫ বছর বয়সী এবং ছোট সন্তান কোলে নিয়েও অনেক নারী সেখানে এসেছেন। এই দৃশ্য তাঁকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। শুরুতে মেয়েকে ভর্তি করালেও, পরে ক্রিয়েটিভ আইটির কর্মকর্তাদের উৎসাহে তিনি নিজেও গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে ভর্তি হন এবং নিয়মিত ক্লাস শুরু করেন।
করোনাকালে পুরো পরিবারের দক্ষতা অর্জন
২০২০ সালে দেশে যখন করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, তখন গৃহবন্দি সময়টিকে কাজে লাগায় তাঁর পুরো পরিবার।
- ফেরদৌস জাহান: গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর, করপোরেট ইংলিশ ও মোশন গ্রাফিক্সে দক্ষতা অর্জন করেন।
- স্বামী রিয়াজ খান: স্ত্রীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এক্সেল, গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইনের কাজ শেখেন।
- মেয়ে নওরিন খান: মায়ের কাছে কাজ শিখে তিনিও ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত হন (বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে অধ্যয়নরত)।
স্বামী রিয়াজ খান জানান, মহামারির ওই কঠিন সময়ে তারা তিন রুমে বসে তিনজন অনলাইনে ক্লাস করতেন এবং একে অপরকে কাজে সহযোগিতা করতেন, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাগত জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।
পেশাগত সাফল্য ও বর্তমান অবস্থান
শুরুতে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস ‘ফাইভার’ (Fiverr)-এর মাধ্যমে কাজ শুরু করেন ফেরদৌস জাহান। ধীরে ধীরে ক্যালেন্ডার, বিজনেস কার্ড, ও লোগো ব্র্যান্ডিংয়ের কাজে তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি অ্যাডোবি স্টক (Adobe Stock) ও শাটারস্টকের (Shutterstock) মতো মাইক্রোস্টক সাইটগুলোতেও তাঁর কাজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে ৩ বছরের সফল ক্যারিয়ারের পর বর্তমানে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করছেন। সেখানে মূল দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড, ব্যানারসহ যাবতীয় গ্রাফিক ডিজাইনের কাজও তিনি নিজেই সামলান।
“বয়স কোনো বাধা নয়”
সাতক্ষীরায় জন্মগ্রহণকারী ও হোম ইকোনমিকস থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ফেরদৌস জাহান মনে করেন, নিজের দক্ষতা বাড়াতে বয়স কোনো বাধা হতে পারে না।
তিনি বলেন, “বয়স কোনো বিষয় না। আমি ৪৮ বছর বয়সে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে চাকরি করছি। মেয়েদের ঘরে বসে না থেকে নিজের দক্ষতা বাড়ানো উচিত। ‘আমি পারব’—এই কথাটি মাথায় সেট করে ভয়কে জয় করতে হবে।”
ভবিষ্যতে নিজের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেন অদম্য এই নারী। ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা পারভিন আক্তারও তাঁর এই সফলতায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, ফেরদৌস জাহান দেশের নারীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
দেশব্যাপী যুব উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ
এদিকে, তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষ করে তুলতে দেশব্যাপী ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়াধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। ‘দেশের ৪৮ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের ৮টি বিভাগের ৪৮টি জেলায় বিনামূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে দেশের স্বনামধন্য আইটি প্রতিষ্ঠান ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’।