
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষকে প্রতিস্থাপিত করছে না; বরং এটি মানুষের কাজ করার ধরনকে বদলে দিচ্ছে। ‘আপওয়ার্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সাম্প্রতিক গবেষণার মূল বার্তা এটিই। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে যখন গণ-অটোমেশন এবং মানুষের চাকরি হারানোর পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, তখন আমাদের প্ল্যাটফর্মের ডেটা দেখাচ্ছে ভিন্ন ও আরও একটি প্রয়োগযোগ্য চিত্র—এআই কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি (Augmentation) করছে, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং পেশাজীবী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান উভয়কেই দ্রুত মানিয়ে নিতে ত্বরান্বিত করছে।
১৩০০টিরও বেশি ক্যাটাগরিতে লাখ লাখ কাজ এবং ফ্রিল্যান্সারদের কোটি কোটি ডলারের উপার্জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের গবেষণায় কয়েকটি প্রধান প্রবণতা উঠে এসেছে:
১. মানুষ ও এআই-এর যৌথ সমন্বয় ভরসা অর্জন করছে এবং নতুন কাজ পেতে সাহায্য করছে:
কাজ নিষ্পত্তিতে এআই-এর সক্ষমতা বাড়লেও মানুষের উপস্থিতি এখনও অপরিহার্য। গ্রাহকরা (ক্লায়েন্ট) সেইসব আউটপুটে বেশি আস্থা প্রকাশ করছেন যেখানে মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। এআই একা যে আউটপুট দেয়, তার তুলনায় ‘মানুষ + এআই’-এর যৌথ কাজের ওপর গ্রাহকদের আস্থা দ্বিগুণ থেকেও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৬% গ্রাহক এআই টুল ব্যবহারকারী ফ্রিল্যান্সারদের কাজে উচ্চমাত্রার আস্থা জানান, যেখানে কেবল এআই-এর তৈরিকৃত কাজে আস্থা রাখেন মাত্র ২৬% গ্রাহক। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘কেপিএমজি’-র তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ৫৪% মানুষ এআই সিস্টেমকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো শীর্ষস্থানীয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোতে (এলএলএম) এখনো গড়ে ১০-১৫% ভুল থেকে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কাজের গুণগত মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে মানুষের তদারকি অত্যন্ত জরুরি।
২. কারিগরি ও অ-কারিগরি—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে এআই:
আপওয়ার্কের উপাত্ত অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সাররা অটোমেশনের (স্বয়ংক্রিয়করণ) চেয়ে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির (Augmentation) কাজে এআই ব্যবহার করছেন বেশি—৭১% ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মাত্র ২৯% ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়করণ। অ-কারিগরি খাত, যেগুলোকে এআই-এর কারণে ঝুঁকির মুখে মনে করা হতো, সেগুলোতেও ইতিবাচক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে:
- ভার্চুয়াল অ্যাডমিন অ্যান্ড প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট: ব্যক্তিগত ডেটা বা কাজের পূর্ণ ব্যবস্থাপনায় এআই-এর ওপর শতভাগ ভরসা করা না হলেও, এআই টুলস প্রজেক্ট ম্যানেজারদের কাজের গতি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।
- গ্রাফিক, প্রেজেন্টেশন ও প্রোডাক্ট ডিজাইন: মানুষের সৃজনশীলতার সাথে এআই ডিজাইনিং টুলের সমন্বয়ে কাজ আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
- করপোরেট ও চুক্তি আইন: আইনি সূক্ষ্মতা ও জটিলতায় মানুষের স্পর্শ ও সূক্ষ্ম চিন্তার বিকল্প নেই; তবে এআই আইনি পেশাজীবীদের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো ভুলহীনভাবে করতে সাহায্য করছে।
- ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং ও অ্যাকাউন্টিং: উচ্চ ঝুঁকিযুক্ত ফিন্যান্সিয়াল সিদ্ধান্তে মানুষের বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য হলেও এআই ব্যবহারের ফলে হিসাবরক্ষকরা আরও নিখুঁত ও বিশ্লেষণধর্মী আউটপুট দিতে পারছেন।
অন্যদিকে, কারিগরি খাত যেমন এআই ও মেশিন লার্নিং (এআই/এমএল)-এ প্রবৃদ্ধি চোখ পড়ার মতো। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে আপওয়ার্কে এআই-সম্পর্কিত গ্রস সার্ভিস ভলিউম (জিএসভি) বার্ষিক ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’ সাব-ক্যাটাগরিতে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫২%-এ। এছাড়া, এআই-সম্পর্কিত কাজ করা ফ্রিল্যান্সাররা সাধারণ কাজের তুলনায় গড়ে ৪০%-এরও বেশি ঘণ্টায় বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
৩. এআই দ্বারা প্রতিস্থাপন বাস্তব, তবে তা সীমিত ও সাময়িক:
যেকোনো প্রযুক্তির রূপান্তরের সাথে কিছু সাধারণ বা প্রাথমিক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। এর ফলে সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাজীবীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের প্ল্যাটফর্মের তথ্য বলছে, অতি নিম্ন-মানের ও লেনদেনভিত্তিক কাজগুলোতেই মূলত এআই প্রতিস্থাপন ঘটছে।
যেমন—কনটেন্ট রাইটিং, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং কপিরাইটিং, মার্কেট রিসার্চ, ডেটা এক্সট্রাকশন এবং সাধারণ ফটোগ্রাফির মতো ক্ষেত্রগুলোতে জেনারেটিভ এআই (যেমন: ChatGPT, DALL-E, Canva) আসার ফলে প্রাথমিক স্তরের কাজে প্রভাব পড়েছে। তবে এই প্রতিস্থাপন পুরো মার্কেটপ্লেসের মোট জিএসভি-র খুবই সামান্য অংশ। প্রাথমিক কাজগুলো এআইয়ের হাতে চলে যাওয়ায় ফ্রিল্যান্সাররা এখন জটিল গবেষণা, ডেটা অ্যানালাইসিস, কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি ও ক্রিয়েটিভ আর্ট ডিরেকশনের মতো উচ্চতর ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন, যেখানে কৌশলগত চিন্তা, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার মতো মানবীয় গুণাবলী প্রয়োজন।
৪. কাজের বিবর্তন জন্ম দিচ্ছে নতুন ‘জেনারেলিস্ট’ সুযোগের:
ওয়েব, মোবাইল ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মতো খাতগুলোতেও এআই-এর প্রভাবে কাজের বিবর্তন ঘটছে। সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কোডিংয়ের চাহিদা কমলেও, জটিল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের জন্য অভিজ্ঞ কোডারদের চাহিদা বাড়ছে। যেসকল কাজে অন্তত ২৫% কোডিং দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেই ফ্রিল্যান্সারদের পারিশ্রমিক ২০২২ সালের নভেম্বরের (ChatGPT চালু হওয়ার সময়) তুলনায় বর্তমানে ১১% বেড়েছে।
বর্তমানে ‘ভাইব কোডিং’ (Vibe Coding)—যেখানে প্রথাগত কোডিং শেখা ছাড়াই Mistral Code, Lovable বা Bolt-এর মতো টুল দিয়ে কাজ করা যায়—জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে কাজগুলো এখন সাধারণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে এমন সব ‘জেনারেলিস্ট’ পেশাজীবীদের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে, যারা এআইকে কাজে লাগিয়ে কোডিং, ডিজাইনিং এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সমন্বয় ঘটাতে পারেন।
উপসংহার: ‘হিউম্যান + এআই’ কর্মীবাহিনীর নতুন যুগ
আপওয়ার্ক মার্কেটপ্লেসের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, কাজের ক্ষেত্রে এআই-এর প্রভাব বহুমুখী। কাজের ক্যাটাগরি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এর প্রভাব নির্ভর করে। আপওয়ার্কের এই অগমেন্টেশন-সাবস্টিটিউশন-ইভোলিউশন (Augmentation-Substitution-Evolution) ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী নেতা ও পেশাজীবীদের নিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং এআই-চালিত বাজারে নিজেদের এগিয়ে রাখার দিকনির্দেশনা দেয়।
(নোট: গবেষণাটি আপওয়ার্কের প্ল্যাটফর্মের কোটি কোটি ডেটা পয়েন্ট এবং ২০২৪-২৫ সালের বাজারভিত্তিক অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে।)
— ড. কেলি মোনাহান
ফাউন্ডার ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আপওয়ার্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট।